Wednesday, January 17, 2018

ভেবলার বাবা, ২, রহিমের কান্ডকারখানা!

ভেবলার বাবা, ২, রহিমের কাণ্ডকারখানা!

ভ্যাবলা যখন ছোট ছিল, তখন একবার ভ্যাবলা খুব অসুস্থ!
রাত ৩টা, ভ্যাবলার ১০৪ডিগ্রী জ্বর আর মা বাবা মাথায় পানি ঢালছে! হটাৎ ভাইয়ের বাসা থেকে খবর আসল, আজ বিকেলে রহিম মারামারি করে পাড়ার এক ছেলের মাথা ফাঁটিয়ে দিয়েছিল, তাই রাত ৩টায় পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে রহিম কে!
...
সেদিনকার বিকেল বেলার ঘটনাঃ
রহিম পাড়ার সমবয়সী ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলতে গেছে, (তখনকার ছেলেরা ফুটবলটাই বেশী ভালবাসত) সাথে ছিল পাশের বাসার গাবলু! "রেল লাইন বহে সমান্তরাল " এর মতই রহিম আর গাবলু পাশাপাশি থাকত কিন্তু সবসময়ই বিপরীত টিমে খেলত! সেদিন খেলতে খেলতে একটা ঝামেলা হয়ে গেল! প্রথমে রেফারির সিদ্ধান্তে অমত, তারপর কথায় কাটাকাটি, অতঃপর হাতাহাতি! খেলা পন্ড হওয়ায় গাবলুর টিম প্রস্থান করলো! গাবলু আর রহিম দের বাড়ির পাশেই ব্যারিষ্টার দাদুর বাড়ি! ব্যারিষ্টার দাদু মারামারির খবর পেয়ে ওদের বুঝাতে গেলেন! "এমন হাতাহাতিতে গুরুতর আহত হতে পারে", "আইনি ঝামেলা হতে পারে", "পাড়ায় মা-বাবার রেপুটেশান খারাপ হতে পারে" কিংবা "স্কুল থেকে রহিম-গাবলু বহিষ্কৃত ও হতে পারে" ইত্যাদি ইত্যাদি বুঝিয়ে শান্ত করতে চাইলেন ওদের!
গাবলু গোমড়া মুখে বলল "দেখুন দাদু, আমার কিন্তু দোষ নেই! ওরাই শুরু করেছিল গন্ডগোলটা!"
আসলেই দোষটা রহিমেরই ছিল! এর আগেও যে বাড়িতে ওরা থাকত, সেখানেও রহিমের মারামারি কুকির্তির জন্যে বাড়িওয়ালা ওদের নোটিস দিয়ে ঊঠিয়ে দিয়েছিল! ব্যারিস্টার দাদুর সামনে কিছু বলতে না পেরে সবাই চলে গেল!
কিন্তু রহিম আর তার দুই চ্যালা বাবলু আর নুন্টু কিছু দূরে গিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঘাপটি মেরে বসে রইল গাবলুর জন্য! গাবলু আসতেই ক্যাপচার্ড! বাবলু নুন্টু দুপাশ থেকে চেপে ধরল আর রহিম বুকের ঠিক মাঝে টেনে ঘুসি মারতে লাগল ...
একটা সময় গাবলু চেতনা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে! এর পরই আবার বাবলু - নুন্টু আর রহিমের লাথি ... সাথে মাথাও ফাটিয়ে দিল ...!
পাড়ার লোক দূর থেকে দেখে ছুটে আসার আগেই রহিম-বাবলু-নুন্টু পাগার পার, তবে কেউ না দেখলে হয়ত গাবলুটা মরেই যেত সেদিন!

রহিমের রিভেঞ্জ পর্ব কিন্তু তখনও শেষ হয় নি! গাবলুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল! হাসপাতালে ভর্তি করে সবাই ফিরে আসছে, রহিমের বাবা আর ভেবলার বাবাও গেছিল! রহিম তখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছে! হটাৎ ব্যারিস্টার দাদুকে আসতে দেখল রহিম, "বুড়ো হাবরা টা আজ গাবলূর সামনে ভাল জ্ঞান দিচ্ছিল! আজ ওর টাক ফাটাবোই!"
রহিম একটা দশ ইঞ্চি ইট নিয়ে একটা বাড়ির ছাদে লুকিয়ে উঠে ঘাপটি মেরে রইল! ব্যারিস্টার দাদু কাছাকাছি আসতেই রহিম ইটটি ছুড়ে দিয়ে লুকিয়ে গেল! সৌভাগ্যক্রমে ডায়রেক্ট হিট হল না, নইলে ই ব্যারিস্টার দাদু স্পট ডেড! কিন্তু তারপরও গুরুতর আহত হলেন দাদু! ইটটি দাদুর মাথার সাইড ঘেসে পাশে পড়েগেল! দাদুর মাথার চামড়া ছিলে রক্তাক্ত অবস্থা!
ঘটনাটি কিন্তু অদেখা হল না! যে একতলার ছাদে লুকিয়ে রহিম কাজটি করেছিল
তার সামনের দোতলা বাড়ির সন্ধ্যা মাসি পুরো ঘটনাটাই দেখেছে! রহিমকে ইট নিয়ে ছাদে উঠতে দেখে মাসি ভেবেছিল ঘুড়ি উরাবে বোধহয়, কিন্তু ইট ছোড়ার কথাটা তিনি ভাবতেই পারেননি! ব্যারিস্টার দাদু আহত হওয়ায় মাসিই প্রথম ছুটে এসে ডাকাডাকি করে সবাইকে ডাকলেন! দেখে ফেললেন ফাতেমা বৌদি আর করীম চাচাও!

শাক্ষ্য প্রমান সাপেক্ষে পুলিশ পরিকল্পনা করে গভীর রাতেই রহিমকে ধরতে আসল, যাতে পালিয়ে যেতে না পারে!
তিন তিনটা এটেম্পট টু মার্ডার এর কেস খেয়েছে রহিম! গাবলু কে একবার খেলার সময়, একবার রাস্তায় আর ব্যারিস্টার দাদুকে মেরেফেলবার চেষ্টায় কেস খেল!

উপায় না পেয়ে রাত ৩টা বাজে খবর পাঠালো ভ্যাবলার বাবাকে! ভ্যাবলার অবস্থা খুবই খারাপ! ভ্যাবলার মা বললেন, "রহিমও তো আমাদেরই ছেলে, তুমি যাও, আমি আছিতো ভ্যাবলার কাছে"!
রাতেই ভ্যাবলার বাবা নিজের ছেলেকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঘরে রেখেই রহিম কে ছাড়াতে চলে গেল!
থানার বড়বাবু রহিমের বাবা আর ভ্যাবলার বাবার সাথে ফুটবল খেলতেন আর খুব ভাল বন্ধু ছিলেন, উনিও আইনি সহায়তা দিলেন!
ভ্যাবলার বাবা আর রহিমের বাবা গিয়ে গাবলুর মা-বাবা আর ব্যারিস্টার দাদুর পা ধরে কান্নাকাটি করে মাপ চাইলেন! "দাদা ও তো নাবালক, আবার মাথায়ও একটু দোষ আছে! আপনারাই তো ছোটবেলা থেকে ওদের মানুষ করেছেন! রহিমের বাবা কেও তো চিনেনই, উনি কেমন মানুষ আপনারা জানেন সবাই! ছেলেটা ভুলকরে ফেলেছে! এবারের মত মাফ করে দিন!" ইত্যাদি ইত্যাদি বলে মন গলানোর চেষ্টা করলেন ভ্যাবলার বাবা!
অবশেষে ভ্যাবলার বাবা আর রহিমের বাবার মুখের দিক চেয়ে কেস তুলে নেওয়া হল, ব্যারিস্টার দাদুও অন্যদের অনুরোধ করে বললেন "পাগল ছেলেটার পাগলামি-ছাগলামির জন্য ওর ভদ্র বাবা-মা কে যেন হয়রানি করবেন না, আমিও ওর বাবার সম্মানের কথাটা ভেবে ক্ষমা করে দিয়েছি ওকে!"

.....
রহিমের পাগলামি টা বন্ধ হতে অনেক বছর লেগে গেছে! ইতো মধ্যে মা বাবা বুড়ো হয়ে গেল, মা মারা গেলেন! রহিমের বোধোদয় হতে বড্ড দেরী হয়ে গেল!
....
to be continued

#DrAakash
#DrFreakShow

ভেবলার বাবা ৩, কুরবানীর গরু!

ভেবলার বাবা ৩,
কুরবানীর গরু!

ভেবলাদের সব আত্মিয়েরা শহরের পূর্ব অংশে থাকে, কিন্তু ভেবলারা শহরের নতুন অংশ তথা পশ্চিম পাশে থাকে ভেবলার পড়ালেখার জন্য! কুরবানীর ঈদ এসেই পড়েছে! প্রতি বছরের মত এবারেও ভেবলার বাবা পুর্ব পাড়াতেই কুরবানী দিবে আত্মীয়দের সাথে! আগে যখন ভেবলারা পূর্ব পাড়ায় থাকত তখন ভেবলার বাবা সবার সাথে একসাথেই হাটে গিয়ে কুরবানির পশু কিনে আনত! পশ্চিম গঞ্জে চলে যাওয়ার পর থেকেও প্রতি বছরই ভেবলার বাবা পূর্ব পাড়ায় এসে সবার সাথে একসাথে হাটে গিয়ে কুরবানীর পশু কিনে আনে! এবারেও ব্যতিক্রম হবে না!
রমজান চাচা, হেমায়েত আঙ্কেল আর রহিম দা তৈরি হয়ে বসে আছে, ভেবলার বাবা এসে পৌছলেই একসাথে হাটে যাবে! রমজান আঙ্কেল এবারে কুরবানি দিবেন না, আর একথা দুদিন আগেই ফোনে জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাই উনি সাতেও নেই পাঁচেও নেই!
ভেবলার বাবা বাড়িতে পৌছেই অবাক, আস্ত একটা এঁড়ে গড়ু গেটের পাশে বাধা! ভেবলার বাবা আকাশ থেকে পড়ল তখন, যখন রমজান কাকু বললেন "এটা আমার গরু, আজ সকালেই কিনে এনাছি! চলেন এবার আপনারটা কিনে আপনাকে বুঝিয়ে দিব!"
ঘটনাটি হল কিছুটি এমনঃ ভেবলার বাবা আর ভেবলার এক পিসি অন্য বাড়িতে থাকেন কিন্তু কোরবানি করেন পৈত্রিক বাড়িতেই, আর বাড়িতে উপস্থিত থাকায় কোরবানিএর পশুর দেখাশোনার দায়িত্ব রমজান কাকুর উপরেই পড়ে, আর তাই তিনি এবার এই দায়িত্ব এড়ানোর জন্য আলাদা কুরবানি দিচ্ছেন, তিনি নিজের গরু নিয়ে থাকবেন আর অন্যদের গরু কি হল তা আর তার দেখা লাগবে না!
যা হোক, সেবার কোনও রকম মন খারাপ করেই আল্লাহ্‌ 'র ভরসায় ভেবলার বাবা তার, রহিম দার আর পিসির গরুটা কিনে আনলেন!
ভেবলার বাবা গরুটিকে বাড়িতে রেখে পশ্চিম গঞ্জে ফিরে গেলেন! রমজান কাকু নিজের গরু নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন বিধায় রমজান কাকুর খাশ লোক হেমায়েত আঙ্কেলের উপর দায়িত্ব পড়ল গরু দেখাশোনার! সারাক্ষন ভজ হরি স্টাইলে "সবই পারি" কিংবা "সন্তানের মত গরুটাকে আগলে রখব" ইত্যাদি ডায়লগ মারা হেমায়েত আঙ্কেল এবার আসল চেহারা দেখাতে লাগলেন! সারাদিন গরুটাকে কিচ্ছুটি খেতে দেন নি! পড়ে একটা হাড়িতে গরম ফূটন্ত ভাতের মাড় এনে গরুটির মুখের সামনে এনে দিলে বেচারা অভুক্ত গরুটা খিদার ঠেলায় সেটাতেই মুখ ডুবিয়ে দিলে এক চুমুক, আর এতেই গরুটার নাক-মুখ-জিহ্বা -গলা অবধি পূড়ে গেল!
সেদিন সকাল থেকে হাল্কা বৃষ্টি হচ্ছে, আর হেমায়েত আঙ্কেল একটা কাঁদা মাখা যায়গায় গরুটাকে বেধে রাখলেন সারা রাতের বৃষ্টি আর কাঁদায় গরুটার জ্বর আর পেট খারাপ হয়ে গেল! আর তার উপর জিহ্বা আর গলায় গরম ভাতের মাড়ের যন্ত্রনায় পরেরদিন ও গরুটা কিচ্ছুটি খেতে পারল না!
তিন দিন পর ঈদ, এই তিন দিন কোনরকম পার হলো হেমায়েত আঙ্কেলের অবহেলায়, রমজান কাকু একটু পর পর ফোন করে ভেবলার বাবাকে, আর বলে "গরুটা এসে দেখতে পারেন না, এটা হয়েছে, ওটা হয়েছে," ইত্যাদি ইত্যাদি! ভেবলার বাবা সেবার খুব অসুস্থ ছিল, তাই ভেবলাও বলছিল এবার ঈদে পূর্ব পাড়ায় না গিয়ে বিশ্রামে থাকতে! তাই ভেবলার বাবা কে কোনও রকম  না পেরেই রমজান কাকু আর হেমায়েত আঙ্কেলের উপর ডিপেন্ড করে থাকতে হল, আবার পিসির রিক্যুয়েস্ট, রমজান কাকু সবার থেকে আলাদা হয়ে কুরবানি দিচ্ছে তাই ভেবলার বাবাকে বাধ্য হয়েই থাকতে হবে, আবার অসুস্থতার করনে ওখানে থেকেও গরুটার দেখাশুনা করতে পারছে না!

ঈদের দিন, রমজান কাকুর গরুটা চকচক করছে, আর ভেবলার বাবা আর পিসির গরুটা চেনাই যাচ্ছেনা, হেমায়েত আঙ্কেলের বিশেষ যত্নে মরমর অবস্থা আর রঙ ফেকাশে হয়ে গেছে!

... চলবে ...

-Dr.Aakash